ব্রেকিং নিউজ:
হুমায়ূন আহমেদের বইয়ের উৎসর্গ পত্র সংকলন
মাহবুব সাঈফ    জুলাই ২৪, ২০১২, মঙ্গলবার,     ০৬:০৩:৪৯

 

নতুন কোন বই বেরুলেই সবার আগে মন কাড়ে এর প্রচ্ছদ আর ভেতরে পাতায় উৎসর্গ পত্র। বই কিনেই অনেকে গোগ্রাসে (সবচেয়ে আগ্রহভরে) পড়ে নেন লেখকের সৃজনশীলতার প্রেরণাদায়ি মানুষ বা চরিত্রগুলো নিয়ে লেখা ছোট-ছোট চরণের উৎসর্গ পত্র।
একাধারে ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার, নাট্যকার এবং চলচ্চিত্রকার ও বাংলা সায়েন্স ফিকশনের পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত হুমায়ূন আহমেদের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা দুই শ’র বেশি। ছাত্রজীবনে একটি নাতিদীর্ঘ উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’(১৯৭২) লিখে হুমায়ূন আহমেদের সাহিত্যজীবনের শুরু । ‘শঙ্খনীল কারাগার’ (১৯৭৩) তাঁর ২য় প্রায়েপন্যাস। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্যে তিনি বিদেশে গেলে তাঁর সাহিত্য রচনায় ঘটে দীর্ঘ বিরতি।
প্রাথমিক অবস্থায় এ দুটি উপন্যাসই হুমায়ূন আহমদকে এনে দেয় দুর্দান্ত খ্যাতি । ‘নন্দিত নরকে’ বা ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ঢাকার মধ্যবিত্ত মানুষদের জীবনকথা। তাদের সুখ-দুঃখ, পাওয়া-না পাওয়ার কথা এবং স্বাধীনতাত্তোর নাগরিক জীবনকে রূপায়ণের কারণেই হুমায়ূন আহমেদ পাঠকদের অনুভূতি ছুঁয়ে যায়।
এরপর রজনী, এপিটাফ, পাখি আমার একলা পাখি, ফেরা, নিষাদ, দারুচিনি দ্বীপ, নির্বাসন, অমানুষ, রূপালী দ্বীপ, শুভ্র, দূরে কোথাও, মন্দ্রসপ্তক, বাদশাহ নামদার, সাজঘর, বাসর, নৃপতি এর মতো পাঠক হৃদয় জয় করা উপন্যাস আসে তার কলম থেকে।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘জোৎস্না ও জননীর গল্প’, ‘১৯৭১’, ‘সূর্যের দিন’ এর মতো উপন্যাস। ‘অনন্ত নক্ষত্র বীথি’, ইরিনা’র মতো কল্পবিজ্ঞান কাহিনীতে অনায়াস ও বিশ্বাসযোগ্য ঢং এ তুলে এনেছেন অতিবাস্তবতা , যা তাকে দেশের সাহিত্যের যাদু বাস্তবতার জনক হিসেবে পরিচিতি দিয়েছে । তরুণদের মাঝে বই পড়ার অভ্যাস তৈরি করেছেন তিনি- গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে তার বই মানেই একুশে বইমেলার বেস্ট সেলার।
হুমায়ূন আহমেদের বইয়ে উৎসর্গ পত্রগুলোতে আছে বৈচিত্র্য – কখনো স্বপ্ন গাঁথুনি, অতলান্ত জীবনবোধ,মৃত্যুর হাহাকার,আবার মাঝে মাঝে সেখানে থাকে সূক্ষ্ম রসিকতা, শুধুই একান্ত শুভ কামনা। নিজের স্ত্রী, পুত্র-কন্যা থেকে শুরু করে ভাই-বোন, মা-বাবা, চেনা-অচেনা মানুষজন অনেককেই উৎসর্গ করেছেন তিনি। এসব কিছু উৎসর্গ পত্রের সংকলন

নন্দিত নরকে
নন্দিত নরকবাসী মা-বাবা, ভাইবোনদের

বহুব্রীহি
জনাব আবুল খায়ের
অভিনয় যাঁর প্রথম সত্তা
অভিনয় যাঁর দ্বিতীয় সত্তা

কোথাও কেউ নেই
কাজী হাসান হাবিব
হে বন্ধু, হে প্রিয়

এই আমি
গাজী শামছুর রহমান
যিনি নিজে চোখ বন্ধ করে থাকেন
কিন্তু আশেপাশের সবাইকে বাধ্য করেন
চোখ খোলা রাখতে

অয়োময়
আমার স্তন্যদাত্রী
নানিজান-কে

মৃন্ময়ীর মন ভালো নেই
তিনি সব সময় হাসেন।
যতোবার তাঁকে দেখেছি, হাসিমুখ দেখেছি।
আমার জানতে ইচ্ছা করে জীবনে কঠিন দুঃসময়ে তিনি যখন কলম হাতে নিয়েছিলেন
তখনও কি তাঁর মুখে হাসি ছিলো?
সর্বজন প্রিয়
আমাদের
রাবেয়া খাতুন

সকল কাঁটা ধন্য করে
কবি ফরহাদ মজহার
প্রিয়তমেষু
কবি-মানুষ যে রাজনীতি নিয়ে জটিল জটিল রচনা লিখে
সবাইকে চমকে দিতে পারে- আমার ধারণা ছিলো না।

আমার প্রিয় ভৌতিক গল্প
আমার তিন কন্যা বিপাশা, শীলা, নোভা।
এরা ভূত বিশ্বাস করে না, কিন্তু ভূতের ভয়ে অস্থির হয়ে থাকে। প্রায়ই দেখা যায় তিন কন্যা ঠাসাঠাসি করে এক বিছানায় ঘুমুচ্ছে, কারণ কেউ একজন ভয় পেয়েছে।

রূপার পালঙ্ক
একবার একজন লেখক আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। আমাদের তিনকন্যা যে
যেখানে ছিলো, লেখকের নাম শুনে উড়ে চলে এলো। আমার মেজো মেয়ে বলল, এতো বড় লেখকের সামনে সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না। তার না-কি পা ঝিমঝিম করছে। আমি তখন লেখককে দেখছিলাম না, মুগ্ধ হয়ে আমার তিনকন্যার উচ্ছ্বাস দেখছিলাম।
সেই লেখকের নাম-
শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

হুমায়ূন আহমেদের শ্রেষ্ঠ উপন্যাস
ভালবেসে যদি সুখ নাহি তবে কেন,
তবে কেন মিছে ভালোবাসা
.......গুলতেকিনকে

দারুচিনি দ্বীপ
মা মনি নোভা আহমেদ
এই উপন্যাসের পান্ডুলিপির প্রথম পাঠিকা নবম শ্রেণীর বালিকা আমার বড় মেয়ে নোভা আহমেদ। সে বই শেষ করেই আমাকে বললো, আমার যখন একুশ বছর বয়স হবে তখন কি তুমি আমাকে এই বইয়ের নায়িকার মতো একা একা সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ড যেতে দেবে? আমি বললাম- না।
সে কঠিন গলায় বলল, তাহলে তুমি এই বইয়ে মিথ্যা কথা কেন লিখলে? আমি তার অভিমানী চোখের দিকে তাকিয়ে বলতে বাধ্য হলাম-আচ্ছা যাও তোমাকেও যেতে দেবো।

তেঁতুল বনে জোছনা
অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ
কিছু মানুষ আছেন যাদের দেখামাত্র মন আনন্দে পূর্ণ হয়, কিন্তু তারা যখন কাছে থাকেন না তখন তাদের কথা তেমন মনে পড়ে না। হায়াৎ ভাই সেই দলের আমার দেখা নিখুঁত ভালো মানুষদের একজন।

আনন্দ বেদনার কাব্য
শামসুর রাহমান
শ্রদ্ধাষ্পদেষু
আমাকে দেখাও পথ ধ্যানী;
চোখ বন্ধ ক’রে অন্ধকারে হেঁটে হেঁটে
এখন কোথায় যাবো? কার কাছে যাবো?

কালো যাদুকর
জুয়েল আইচ
জাদুবিদ্যার এভারেস্টে যিনি উঠেছেন।
এভারেস্টজয়ীরা শৃঙ্গ বিজয়ের পর নেমে আসেন।
ইনি নামতে ভুলে গেছেন।

দেখা না-দেখা
নিষাদ হুমায়ূন, তুমি যখন বাবার লেখা এই ভ্রমণ কাহিনী পড়তে শুরু করবে তখন আমি হয়তোবা অন্য এক ভ্রমণে বের হয়েছি। অদ্ভুত সেই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা কাউকেই জানাতে পারব না। আফসোস!

তিথির নীল তোয়ালে
বিখ্যাত টেলিভিশন অভিনেত্রী সুবর্ণা মুস্তাফা
আমার জানতে ইচ্ছে করে, একজন মানুষ এত ভাল অভিনয় কি ভাবে করেন?

লীলাবতী
শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ দাশ
কবি, আমি কখনো গদ্যকার হতে চাই নি।
আমি আপনার মতো একজন হতে চেয়েছি।
হায়, এত প্রতিভা আমাকে দেয়া হয় নি।

বাসর
স্নিগ্ধা করিম
আমার উৎসর্গপত্রগুলি সে খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ে। আমি না-কি উৎসর্গপত্রে অনেক মজা করি। তার ধারণা কোন একদিন তাকে একটি বই আমি উৎসর্গ করব। সেখানে অনেক মজার কথা থাকবে।
বই উৎসর্গ করা হলো।

এই মেঘ, রৌদ্রছায়া
ছবি পাড়ায় আমার ছোট্ট একটা অফিস আছে। সেই অফিসে রোজ দুপুরবেলা অভিনেতা মাহফুজ আহমেদ উপস্থিত হয় এবং হাসিমুখে বলে, ভাত খেতে এসেছি। সে আসলে আসে কিছুক্ষণ গল্প করার জন্যে। ইদানীনং মাহফুজ খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। দুপুরবেলা তার হাসিমুখ দেখতে পাই না। মাহফুজ কি জানে, প্রতিদিন দুপুরে আমি মনে মনে তার জন্যে অপেক্ষা করি?

আমি এবং কয়েকটি প্রজাপতি
তার নাম রোমেল। আমি তাকে রহস্য করে ডাকি ত্রুস্ক, রাশিয়ান সাবমেরিন ত্রুস্ক, নাবিকদের নিয়ে সাগরে তলিয়ে যাওয়া ত্রুস্ক। রোমেলকে দেখলেই আমার কেন জানি তলিয়ে যাওয়া সাবমেরিনের কথা মনে হয়। সে পড়াশোনা করেছে রাশিয়ায়। রুপবতী এক রাশিয়ান মেয়েকে বিয়ে করেছে। মেয়েটি রাশিয়ার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। তাদের পুতুলের মতো একটা ছেলে আছে। রোমেল তার রাশিয়ান পরিবার নিয়ে পাবনায় বাস করছে। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ তার মাস্টার্স ডিগ্রি আছে কিন্তু সে জীবন নির্বাহ করছে পত্রিকা বিক্রি করে।
আখতারুজ্জামান রোমেল (ত্রুস্ক)

আসমানীরা তিন বোন
আমি একজনকে চিনি যিনি দাবি করেন তাঁর শরীরের পুরোটাই কলিজা। চামড়ার নিচে রক্ত মাংস কিছু নেই, শুধুই কলিজা। এ ধরনের দাবি করার জন্য সত্যি সত্যিই অনেক বড় কলিজা লাগে।
প্রণব ভট্ট।

বৃষ্টি ও মেঘমালা
মধ্যদুপুরে অতি দীর্ঘ মানুষের ছায়াও ছোট হয়ে যায়।
অধ্যাপক তৌফিকুর রহমানকে।
যাঁর ছায়া কখনো ছোট হয় না।

এম. এস./ ১৪.১৫
বিভাগ: শীর্ষ সংবাদ   দেখা হয়েছে ৬৯৬৯৪ বার.

 

শেয়ার করুন :

 
মন্তব্য :